ইমরান হোসেন হিমু
বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন সাতটি দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৭
সালে গঠিত হয়েছিল বঙ্গোপসাগর বহুমুখী কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা (BIMSTEC)। যদিও দীর্ঘদিন এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিমসটেকের গুরুত্ব বাড়ছে। আগামী ৩ এপ্রিল, থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ এবার এই জোটের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে, যা নেতৃত্বের নতুন দ্বার উন্মোচনের ইঙ্গিত বহন করে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বিমসটেক অঞ্চলের সম্মিলিত জিডিপি ৪.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং জনসংখ্যা প্রায় ১.৭ বিলিয়ন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক সংযোগ দুর্বল হওয়ায় এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য প্রবাহ খুবই সীমিত। বিমসটেক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA) কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং আমদানি ব্যয় কমবে।
অপরদিকে, পরিবহন সংযোগ জোরদার করাও জরুরি। মোংলা ও পায়রা বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে, যদি বিমসটেকের মধ্যে সড়ক, রেল ও সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো আরও আধুনিক করা হয়। নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে স্বাবলম্বী করতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, প্রযুক্তি খাত, এবং ব্লু ইকোনমি কেন্দ্রিক উন্নয়ন নীতি যদি বিমসটেকের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।
পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়: নতুন দিগন্ত
বিমসটেক পর্যটন নীতি কার্যকর হলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ২০১৯ সালে এই অঞ্চলে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৮০ মিলিয়ন, যা মহামারির পর আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হলে দেশীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারবে।
এ ছাড়া, বিমসটেক সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা গেলে অঞ্চলভিত্তিক ঐক্য আরও দৃঢ় হবে। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি এবং ভাষাগত বৈচিত্র্য এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতের প্রভাব মোকাবিলায় কৌশল
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা বেশ স্পর্শকাতর। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিমসটেকের ভেতরে ভারত সবসময় একটি বড় প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি এই জোটের নেতৃত্ব সুসংহত করতে চায়, তাহলে কিছু কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
বিকল্প আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা: বাংলাদেশকে কেবল ভারতের উপর নির্ভর না করে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।
সীমান্ত বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনা: ভারতের উপর নির্ভরশীল না থেকে, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
বহুপাক্ষিক ফোরামে সক্রিয়তা: বিমসটেক ছাড়াও সার্ক ও আসিয়ান-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক অবস্থান সুসংহত করতে হবে।
ড. ইউনূসের ভূমিকা: কৌশলগত প্রভাবক
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার জন্য পরিচিত। তার উপস্থিতি বিমসটেককে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। তার ভাবমূর্তি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক কূটনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সাহায্য করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ড. ইউনূসের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বিমসটেকের দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক ব্যবসায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারেন।
বাংলাদেশের নেতৃত্ব: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বিমসটেকের নেতৃত্ব নেওয়া বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক সুযোগ। তবে, এর সফল বাস্তবায়নের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বৈদেশিক নীতিগত জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং পারস্পরিক আস্থার অভাব অন্যতম প্রধান বাধা।
এর সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
◑ বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন
◑ সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
◑ টেকসই জ্বালানি সহযোগিতা ও প্রযুক্তি স্থানান্তর
◑ বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং জোরদার করা
◑ শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা বৃদ্ধি করা
◑ শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো
বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের সামনে রয়েছে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জোটের নেতৃত্ব নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই জোটের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও শক্তিশালী কূটনৈতিক কৌশল যদি বাংলাদেশ গ্রহণ করতে পারে, তবে বিমসটেকের মাধ্যমে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ রয়েছে।
লেখক: সোশ্যাল এক্টিভিস্ট